জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ কত?

জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ কত? ২০২৬ সালের হালনাগাদ হিসাব, সহজ উদাহরণ ও সাধারণ প্রশ্নের উত্তর

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২১ অক্টোবর ২০২৬

জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, দাম নিয়েও কথা হয়ে গেছে। এরপর দলিল লেখকের কাছে গিয়ে খরচের অঙ্ক শুনে অনেকেই চমকে যান। কেউ বলে ৭০ হাজার, কেউ বলে দুই লাখ। আসল খরচ কত, কেন কম-বেশি হয়, আর কোনটা সরকারি ফি আর কোনটা বাড়তি চাওয়া, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।

এই লেখায় সহজ ভাষায় সবটা গুছিয়ে বলছি। কোন কোন খাতে টাকা লাগে, কীভাবে হিসাব করবেন, নিজে হিসাব দেখার সরকারি উপায় কী এবং দালালের ফাঁদ কীভাবে এড়াবেন, সবই পাবেন।

আগে বুঝে নিন: দলিল রেজিস্ট্রেশনে টাকা যায় কোথায়?

জমি রেজিস্ট্রেশনে একটিমাত্র ফি দিতে হয় না। কয়েকটি আলাদা খাতে সরকারি ফি ও কর দিতে হয়। প্রধান খাতগুলো এই:

  • রেজিস্ট্রেশন ফি: দলিলে লেখা মূল্যের ১%
  • স্ট্যাম্প শুল্ক: দলিলে লেখা মূল্যের ১.৫%
  • স্থানীয় সরকার কর: সাধারণত দলিল মূল্যের ৩%। তবে সিটি করপোরেশন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের (উপজেলাধীন নয়) আওতাভুক্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে ২%
  • উৎসে কর (গেইন ট্যাক্স): এলাকাভেদে আলাদা
  • ছোটখাটো ফি: ই-ফি, এন-ফি, এনএন-ফি, কোর্ট ফি ইত্যাদি

স্ট্যাম্প শুল্কের হার ১.৫% এবং রেজিস্ট্রেশন ফি ১%, এই তথ্য একাধিক সূত্রে মিলেছে। স্থানীয় সরকার কর দলিলে লিখিত মোট মূল্যের ৩%, তবে সিটি করপোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অধীন হলে ২%।

মূল কথা: খরচ কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক নয়। এটি আপনার দলিলে লেখা জমির মূল্যের শতাংশ হিসেবে ঠিক হয়। প্রতি শতকে এত টাকা, এমন কোনো ধ্রুব হার নেই।

উৎসে কর: যে খাতটি সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়

চারটি খাতের মধ্যে ওপরের তিনটির হার মোটামুটি স্থির। কিন্তু উৎসে করের হার এলাকা ও জমির শ্রেণির ওপর নির্ভর করে এবং কয়েক বছর পরপর বদলায়।

কিছু উদাহরণ দেখা যাক:

  • ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এনবিআর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ঙ শ্রেণির জমির রেজিস্ট্রেশনে করের হার ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়। bdnews24
  • ২০২৫ সালে বাজেটের সময় আরেক দফা পরিবর্তন আসে। ২৬ মে ২০২৫ তারিখের গেজেটে এলাকা ও জমির শ্রেণি অনুযায়ী নতুন করহার নির্ধারণ হয়, যা ১ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর। এতে পৌরসভা এলাকা দুটি সারণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম সারণির এলাকায় ৩% কর, আর দ্বিতীয় সারণির এলাকায় ২% বা শতাংশপ্রতি ৫০০ টাকা, যেটি বেশি।
  • আরও আগে একটি সময়ে রাজউক ও সিডিএ এলাকায় উৎসে কর ৪ থেকে বাড়িয়ে ৮ শতাংশ, জেলা সদরের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের অন্য এলাকায় ৩ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছিল।

আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জমি রেজিস্ট্রেশনের উৎসে করের হার বদলেছে কি না, তা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হতে পারিনি। তাই এই খাতের চূড়ান্ত হার জানতে নিচে বলা সরকারি ক্যালকুলেটর বা স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ওপর ভরসা করুন। ইন্টারনেটের অনেক ব্লগে পুরোনো হার ঘুরেফিরে লেখা হচ্ছে।

একটি বাস্তব উদাহরণ: ২০ লাখ টাকার জমির খরচ

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে সরকারি দলিল ক্যালকুলেটরের একটি উদাহরণ আছে। বাগেরহাটের চিতলমারী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি জমির সাফকবলা দলিলে (ইউনিয়ন অধিভুক্ত, স্থাপনা ছাড়া) মোট নিবন্ধন খরচ আসে ১ লাখ ৩০ হাজার ৭১০ টাকা।

হিসাবটা বুঝতে সুবিধা হবে, তাই ভেঙে দেখাই। গ্রামীণ এলাকায় উৎসে কর ১% ধরলে:

খাতহার২০ লাখ টাকার জমিতে
রেজিস্ট্রেশন ফি১%২০,০০০ টাকা
স্ট্যাম্প শুল্ক১.৫%৩০,০০০ টাকা
স্থানীয় সরকার কর৩%৬০,০০০ টাকা
উৎসে কর১% (গ্রামীণ এলাকায়)২০,০০০ টাকা
মোট৬.৫%১,৩০,০০০ টাকা

ক্যালকুলেটরের ফলাফল ১,৩০,৭১০ টাকা। অর্থাৎ বাকি প্রায় ৭১০ টাকা গেছে ই-ফি, এন-ফি, হলফনামার স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফির মতো ছোট খাতে। এখানে উৎসে কর ১% ধরা, শহর এলাকায় এটি বেশি হবে। তাই এই হিসাবকে নিছক উদাহরণ হিসেবে দেখবেন।

এক নজরে মোটামুটি ধারণা:

  • গ্রাম বা ইউনিয়ন এলাকায় মোট সরকারি খরচ মোটামুটি ৬.৫% থেকে ৭%
  • পৌরসভা বা শহর এলাকায় ৭.৫% থেকে ৮% বা তার বেশি
  • ঢাকা-চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় আরও বেশি হতে পারে

নিজেই খরচ হিসাব করবেন কীভাবে? সরকারি “দলিল ক্যালকুলেটর”

এই লেখার সবচেয়ে কাজের তথ্যটি এখানে। সরকার একটি অনলাইন ক্যালকুলেটর বানিয়েছে, যা বিনা মূল্যে ব্যবহার করা যায়।

ক্যালকুলেটরটি পাওয়া যাবে dolil.gov.bd ওয়েবসাইটে। এটি আইন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদপ্তরের জন্য তৈরি। ‘দলিল ফিস ক্যালকুলেটর’ নামের মোবাইল অ্যাপেও খরচ দেখা যায়।

ব্যবহারের ধাপ:

  1. dolil.gov.bd সাইটে গিয়ে ফি ক্যালকুলেটর বেছে নিন
  2. দলিলের ধরন (যেমন সাফকবলা) নির্বাচন করুন
  3. বিভাগ, জেলা ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিস বাছুন
  4. জমির অবস্থান, মূল্য, স্থাপনা আছে কি না, বিক্রেতার ধরন, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও ভাষা দিন
  5. ফলাফল বাটনে চাপ দিলেই সরকারি খরচের পূর্ণ হিসাব পাবেন

ক্যালকুলেটর শুধু অঙ্ক বলে না। কোন খাতের টাকা সোনালী ব্যাংকের কোন কোডে পে-অর্ডার বা চালান করতে হবে, সে তথ্যও দেয়।

এর কার্যকারিতা নিয়ে ওই প্রতিবেদনের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। কুমিল্লার একজন বাসিন্দাকে ৪২ শতক জমির নিবন্ধনে দলিল লেখকরা ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা খরচ বলেছিলেন। ক্যালকুলেটরে তিনি দেখেন সরকারি খরচ মাত্র ৬৮ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকার মধ্যেই কাজ শেষ হয়। তাই দলিল লেখকের কাছে যাওয়ার আগেই নিজে একবার হিসাব করে নেওয়া ভালো।

“সর্বনিম্ন বাজারমূল্য” নিয়ে জেনে রাখুন

অনেকে ভাবেন, দলিলে যা খুশি দাম লিখে দিলেই হলো। আসলে তা নয়। সরকার প্রতিটি মৌজার জমির একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। এই মূল্যের নিচে জমি রেজিস্ট্রি করা যাবে না। এই মূল্য সময়ে সময়ে হালনাগাদ হয়, আর সর্বশেষ সংশোধনে ঢাকার অনেক মৌজার রেট বেড়েছে।

আপনার এলাকার ন্যূনতম মূল্য কত, তা dolil.gov.bd সাইটের “সম্পত্তির বাজারমূল্য” অংশে মৌজা অনুযায়ী দেখা যায়। প্রকৃত দাম এর চেয়ে বেশি হলে দলিলে সেই দামই লিখতে হবে, আর খরচের হিসাবও হবে সেই মূল্যের ওপর।

অন্য ধরনের দলিলে খরচ আলাদা

সব দলিলের হার এক নয়। কয়েকটি উদাহরণ:

  • সাফকবলা (বিক্রয়) দলিল: ওপরে আলোচিত হার প্রযোজ্য
  • দান দলিল: স্থাবর সম্পত্তির দানপত্র দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়। কিছু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে ফি তুলনামূলক কম, আর সেই তালিকার বাইরে দান করলে কবলা দলিলের মতোই ফি লাগে। ক্ষেত্রবিশেষে হার আলাদা, তাই ক্যালকুলেটরে দলিলের ধরন বেছে হিসাব করুন।
  • বিক্রেতা ডেভেলপার বা প্রতিষ্ঠান হলে: বিক্রেতার ধরন বদলালে কর কাঠামো বদলায়, ক্যালকুলেটরে এই অপশন আছে

জমি রেজিস্ট্রেশনের পর আরও কী কী খরচ?

রেজিস্ট্রেশন শেষ মানে সব শেষ নয়। জমির মালিকানা সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নামে আনতে হলে নামজারি (মিউটেশন) করতে হয়। এতে আলাদা সরকারি ফি লাগে, আর এর সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করে দাখিলা নেওয়ার বিষয়টিও আছে। এসব সেবার আবেদন সরকারি ভূমি সেবা পোর্টালে অনলাইনেও করা যায়। নামজারি না করলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, ঋণ নেওয়া বা উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ায় ঝামেলা হতে পারে।

এ ছাড়া কিছু বাড়তি খরচের কথা মাথায় রাখুন:

  • দলিল লেখকের পারিশ্রমিক
  • প্রয়োজনে আইনজীবীর ফি (জমির কাগজ যাচাই করতে)
  • দলিলের সার্টিফায়েড কপি তোলার ফি

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ১০ লাখ টাকার জমি রেজিস্ট্রি করতে মোটামুটি কত লাগবে?
গ্রামীণ এলাকায় সরকারি খরচ মোটামুটি ৬.৫% ধরলে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। শহর বা পৌর এলাকায় উৎসে কর বেশি হওয়ায় ৭৫-৮০ হাজার টাকা বা আরও বেশি হতে পারে। এটি আনুমানিক হিসাব। সঠিক অঙ্ক ক্যালকুলেটরে দেখুন।

২. কেউ কি নিজে দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন, দালাল ছাড়া?
আইনত পারেন। ক্যালকুলেটর থেকে খরচ জেনে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে নিজে কাজ করার উদাহরণ আছে, যেমন কুমিল্লার ওই বাসিন্দা। তবে কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নেওয়া ভালো।

৩. টাকা কীভাবে ও কোথায় জমা দিতে হয়?
সাধারণত সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় পে-অর্ডার বা চালানের মাধ্যমে। রেজিস্ট্রেশন ফি, ই-ফি ও এন-ফি একসঙ্গে একটি পে-অর্ডারে জমা হয়। স্থানীয় সরকার কর আলাদা পে-অর্ডারে দিতে হয়। উৎসে কর জমা হয় নির্ধারিত চালানে। আর এনএন-ফি নগদে রেজিস্ট্রি অফিসে দিতে হয়। কোন খাতে কোন কোড, তা ক্যালকুলেটরেই দেওয়া থাকে।

৪. দলিলে কম দাম লিখে খরচ বাঁচানো যায়?
না। ন্যূনতম বাজারমূল্যের নিচে দলিল হবে না। তা ছাড়া কম দাম লিখলে ভবিষ্যতে বিক্রির সময় নিজের মূলধনী লাভের হিসাবেও সমস্যা হতে পারে। আইনি ঝুঁকি নিয়ে এই পথে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

৫. প্রতি বছর কি রেজিস্ট্রেশন খরচ বদলায়?
মৌজার ন্যূনতম মূল্য প্রতি অর্থবছরে হালনাগাদ হতে পারে, আর উৎসে করের হার বাজেটের সময় বদলাতে পারে। তাই পুরোনো লেখা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকারি সাইটের তথ্য দেখুন।

প্রতারণা এড়াতে ছোট কিছু পরামর্শ

  • দলিল লেখকের দেওয়া অঙ্ককে চূড়ান্ত না ভেবে ক্যালকুলেটরের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে নিন
  • সরকারি ফি আর দলিল লেখকের সেবা-খরচ আলাদা করে জিজ্ঞেস করুন
  • ব্যাংক চালান বা পে-অর্ডারের রসিদ সংরক্ষণ করুন
  • জমির মালিকানা, খতিয়ান, পর্চা ও দখলের তথ্য রেজিস্ট্রেশনের আগেই যাচাই করুন
  • ইন্টারনেটের যেকোনো ব্লগের হারকে (এই লেখাসহ) শেষ কথা মনে না করে সরকারি সূত্রে মিলিয়ে নিন

শেষ কথা

জমি রেজিস্ট্রেশনের খরচ প্রধানত দলিল মূল্যের ওপর ১% রেজিস্ট্রেশন ফি, ১.৫% স্ট্যাম্প শুল্ক, ৩% (বা ২%) স্থানীয় সরকার কর এবং এলাকাভেদে উৎসে কর নিয়ে গঠিত। সব মিলিয়ে গ্রামীণ এলাকায় সরকারি খরচ মোটামুটি ৬.৫-৭% আর শহরে আরও বেশি। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো dolil.gov.bd ক্যালকুলেটরে নিজে হিসাব করা এবং সন্দেহ থাকলে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সরাসরি জানতে চাওয়া।

দাবিত্যাগ: এটি সাধারণ তথ্যের জন্য লেখা, আইনি বা কর-সংক্রান্ত পরামর্শ নয়। বড় অঙ্কের লেনদেনের আগে একজন আইনজীবী বা অভিজ্ঞ দলিল বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র

  1. প্রথম আলো, “জমি নিবন্ধন খরচের হিসাব জানা যাবে এক ক্লিকে”: https://www.prothomalo.com/bangladesh/di6ka8e3zh
  2. সরকারি দলিল ক্যালকুলেটর (আইন মন্ত্রণালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর): dolil.gov.bd
  3. বিডিনিউজ২৪, জমি রেজিস্ট্রেশনে এনবিআরের প্রজ্ঞাপন (৫ ডিসেম্বর ২০২৩): https://bangla.bdnews24.com/economy/606hwzq5lz
  4. ইত্তেফাক, “এলাকাভেদে আবারও কমলো জমির রেজিস্ট্রেশন কর”: https://www.ittefaq.com.bd/669152
  5. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর): nbr.gov.bd

Leave a Comment