হলফনামা কি, নোটারি পাবলিক হলফনামার নমুনা, কোর্ট ম্যারেজ হলফনামা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নমুনা ও হলফনামা ফরমেট জানুন। PDF ও Word ফাইল ডাউনলোড করুন।
সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পাসপোর্ট অফিসে কাজ করতে গেলে প্রায়ই “হলফনামা” চাওয়া হয়। অনেকেই জানেন না হলফনামা কি, কীভাবে লিখতে হয় বা কোথায় সঠিক ফরমেট পাওয়া যায়। তাই এই পোস্টে আমরা সহজ ভাষায় হলফনামার সংজ্ঞা, ব্যবহার, ফরমেট, নোটারি পাবলিক হলফনামার নমুনা, কোর্ট ম্যারেজ হলফনামার কাঠামো এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নমুনা তুলে ধরেছি। পোস্টের শেষে হলফনামা নমুনা ডাউনলোড PDF এবং Word ফাইলের লিংকও পাবেন।

হলফনামা কি?
হলফনামা (ইংরেজিতে Affidavit) হলো একটি লিখিত বিবৃতি, যেখানে কোনো ব্যক্তি শপথ বা সত্যপাঠ করে নিজের জানা তথ্য সত্য বলে ঘোষণা করেন। এই বিবৃতি সাধারণত একজন নোটারি পাবলিক, ম্যাজিস্ট্রেট বা শপথ গ্রহণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে স্বাক্ষর করে সত্যায়িত করা হয়।
সহজ কথায়, হলফনামা হলো “আমি শপথ করে বলছি, এই তথ্যগুলো আমার জানামতে সম্পূর্ণ সত্য”—এই মর্মে দেওয়া একটি আইনি ঘোষণাপত্র। হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে আইনত শাস্তির সম্মুখীন হতে হতে পারে। তাই প্রতিটি তথ্য যাচাই করে লেখা জরুরি।
হলফনামা ও সাধারণ ঘোষণাপত্রের পার্থক্য
সাধারণ ঘোষণাপত্রে শুধু আপনার বক্তব্য থাকে। কিন্তু হলফনামায় আপনি শপথ করে বক্তব্য দেন এবং একজন কর্তৃপক্ষ তা সত্যায়িত করেন। এ কারণেই হলফনামার আইনি গুরুত্ব তুলনামূলক বেশি।
হলফনামা কেন প্রয়োজন হয়?
বাংলাদেশে বিভিন্ন কাজে হলফনামা লাগে। যেমন:
- নাম, জন্মতারিখ বা পিতা-মাতার নামের ভুল সংশোধনের জন্য
- পাসপোর্ট, ভিসা বা জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কাজে
- জমি বা সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার বা হারানো দলিলের ক্ষেত্রে
- চাকরি, টেন্ডার বা নির্বাচনী প্রার্থিতার তথ্য প্রদানে
- বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ বা অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে
- ব্যাংক ঋণ বা আর্থিক লেনদেনের ঘোষণায়
- আদালতে মামলার আবেদনের সঙ্গে তথ্য সমর্থনে
হলফনামা ফরমেট: কাঠামো কেমন হয়?
হলফনামার কোনো একটিমাত্র বাঁধাধরা ফরমেট নেই; প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষা বদলায়। তবে প্রায় সব হলফনামায় নিচের অংশগুলো থাকে:
- শিরোনাম: “হলফনামা” বা “এফিডেভিট”
- ঘোষকের পরিচিতি: নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বয়স, পেশা, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
- শপথবাক্য: “আমি শপথ করিয়া ঘোষণা করিতেছি যে…”
- তথ্যের ধারা: ক্রমিক নম্বর দিয়ে একটি একটি করে বিবৃতি
- সত্যতার ঘোষণা: “উপরোক্ত বক্তব্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য”
- স্বাক্ষর ও তারিখ: ঘোষকের স্বাক্ষর, তারিখ ও স্থান
- সত্যায়ন: নোটারি পাবলিকের সিল, স্বাক্ষর ও নোটারি রেজিস্টার নম্বর
সাধারণ হলফনামার নমুনা
হলফনামা
আমি ……………… (নাম), পিতা: ……………… , মাতা: ……………… , জাতীয় পরিচয়পত্র নং ……………… , ঠিকানা: ……………… , বয়স ……… বছর, পেশা ……………… , ধর্ম ……………… , জাতীয়তা বাংলাদেশি, শপথপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে—
১। আমি উপরে বর্ণিত ঠিকানার স্থায়ী বাসিন্দা।
২। ……………… (এখানে মূল বিষয়টি স্পষ্টভাবে লিখুন)।
৩। উপরিউক্ত বিষয়টি আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য। ইহার কোনো অংশ মিথ্যা প্রমাণিত হইলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে আমার কোনো আপত্তি থাকিবে না।
ঘোষকের স্বাক্ষর: ……………… তারিখ: ………………
আমার সম্মুখে ঘোষক স্বাক্ষর করিয়াছেন এবং শপথ গ্রহণ করিয়াছেন। নোটারি পাবলিক (সিল ও স্বাক্ষর)
নোটারি পাবলিক হলফনামার নমুনা ও সত্যায়নের প্রক্রিয়া
নোটারি পাবলিক হলফনামার নমুনা সাধারণ ফরমেটের মতোই; পার্থক্য হলো, এতে নোটারির সত্যায়ন অংশ যুক্ত থাকে। সাধারণ প্রক্রিয়াটি এরকম:
- প্রয়োজন অনুযায়ী হলফনামার খসড়া তৈরি করুন (নিজে বা আইনজীবীর সাহায্যে)।
- প্রযোজ্য মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপারে হলফনামা টাইপ বা প্রিন্ট করুন। স্ট্যাম্পের মূল্য ও ফি নোটারির কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো, কারণ তা কাজের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
- মূল জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টসহ নিজে নোটারি পাবলিকের কাছে উপস্থিত হন।
- নোটারির সামনে হলফনামা পড়ে শপথ গ্রহণ করুন এবং স্বাক্ষর দিন।
- নোটারি সিল, স্বাক্ষর ও রেজিস্টার নম্বর দিয়ে হলফনামা সত্যায়িত করবেন।
গুরুত্বপূর্ণ: ঘোষককে অবশ্যই নিজে উপস্থিত থাকতে হবে। অন্য কারও মাধ্যমে হলফনামা সত্যায়িত করানো যায় না।
নমুনা কপি কোর্ট ম্যারেজ হলফনামা
অনেকে “কোর্ট ম্যারেজ হলফনামা” লিখে সার্চ করেন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার: শুধু একটি হলফনামা তৈরি করলেই আইনত বিবাহ সম্পন্ন হয় না। বাংলাদেশে বিবাহ ধর্মীয় ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্পন্ন ও নিবন্ধিত হতে হয়। মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিননামা ও নিবন্ধন করা হয়। হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন অনুসরণ করতে হয়। আদালতে বা নোটারির কাছে করা হলফনামা সাধারণত বিবাহের তথ্য ঘোষণা ও সমর্থনের জন্য সহায়ক দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া বিবাহের ন্যূনতম বয়স পাত্রীর ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং পাত্রের ক্ষেত্রে ২১ বছর। এর কম বয়সে বিবাহ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে নিষিদ্ধ।
বিবাহ সংক্রান্ত হলফনামার নমুনা কাঠামো
হলফনামা
আমরা (১) ……………… , পিতা ……………… , বয়স ……… বছর এবং (২) ……………… , পিতা ……………… , বয়স ……… বছর, উভয়ে শপথপূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে—
১। আমরা উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বেচ্ছায়, কোনো প্রকার চাপ বা প্রলোভন ছাড়াই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছি।
২। বিবাহ অনুষ্ঠানের তারিখ ……………… , স্থান ……………… , দেনমোহর ……………… টাকা।
৩। আমাদের কেহই পূর্বে বিবাহিত নহি (অথবা পূর্ব বিবাহের তথ্য: ………………)।
৪। উপরোক্ত তথ্য সম্পূর্ণ সত্য।
ঘোষকদ্বয়ের স্বাক্ষর ও তারিখ নোটারি পাবলিকের সত্যায়ন
এটি শুধু একটি সাধারণ কাঠামো। আপনার ক্ষেত্রে কী কী তথ্য ও কাগজ লাগবে, তা নিশ্চিত হতে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের পরামর্শ নিন।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কি এবং এর নমুনা
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (মোক্তারনামা বা ক্ষমতাপত্র) হলো এমন একটি আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (প্রদানকারী বা প্রিন্সিপাল) অন্য একজনকে (এজেন্ট বা অ্যাটর্নি) নিজের পক্ষে নির্দিষ্ট কাজ করার ক্ষমতা দেন। যেমন জমি বিক্রি, মামলা পরিচালনা, ব্যাংক হিসাব পরিচালনা বা সম্পত্তি দেখাশোনা।
প্রবাসীরা দেশে থাকা আত্মীয়কে এই ক্ষমতা দিতে প্রায়ই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ব্যবহার করেন। বিদেশ থেকে করা হলে সাধারণত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের সত্যায়ন লাগে। জমি হস্তান্তরের মতো কাজে দলিল নিবন্ধনের নিয়মও প্রযোজ্য হতে পারে।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নমুনা
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (ক্ষমতাপত্র)
আমি ……………… , পিতা ……………… , ঠিকানা ……………… , জাতীয় পরিচয়পত্র নং ……………… (এর পর “ক্ষমতা প্রদানকারী”), সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় ……………… , পিতা ……………… , ঠিকানা ……………… (এর পর “প্রতিনিধি”)-কে আমার পক্ষে নিম্নোক্ত কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা প্রদান করিতেছি—
১। ……………… (কাজের নির্দিষ্ট বিবরণ, যেমন সম্পত্তির দাগ নং, খতিয়ান নং, ব্যাংক হিসাব ইত্যাদি)।
২। উক্ত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলে স্বাক্ষর, আবেদন দাখিল ও ফি পরিশোধ করিবার ক্ষমতা প্রতিনিধির থাকিবে।
৩। প্রতিনিধি এই ক্ষমতাবলে যাহা করিবেন, তাহা আমার নিজের কৃত বলিয়া গণ্য হইবে।
ক্ষমতা প্রদানকারীর স্বাক্ষর ও তারিখ: ……………… সাক্ষী ১: ……………… সাক্ষী ২: ………………
টিপস: ক্ষমতার পরিধি যত স্পষ্ট ও সীমিত লিখবেন, ঝুঁকি তত কমবে। “সব কাজের ক্ষমতা” ধরনের অস্পষ্ট ভাষা এড়িয়ে চলুন।
হলফনামা নমুনা ডাউনলোড PDF ও Word
নিচের লিংক থেকে নমুনা ফাইলগুলো ডাউনলোড করে প্রয়োজন অনুযায়ী ফাঁকা অংশ পূরণ করে নিন।
| ফাইলের নাম | ফরমেট | ডাউনলোড |
|---|---|---|
| সাধারণ হলফনামার নমুনা | PDF ডাউনলোড করুন | |
| সাধারণ হলফনামার নমুনা | Word (.docx) | Word ডাউনলোড করুন |
| কোর্ট ম্যারেজ হলফনামার নমুনা | PDF ডাউনলোড করুন | |
| কোর্ট ম্যারেজ হলফনামার নমুনা | Word (.docx) | Word ডাউনলোড করুন |
| পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নমুনা | PDF ডাউনলোড করুন | |
| পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নমুনা | Word (.docx) | Word ডাউনলোড করুন |
দ্রষ্টব্য: এই নমুনাগুলো শুধু সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। এগুলো আইনি পরামর্শ নয়। আপনার নির্দিষ্ট প্রয়োজনে চূড়ান্ত দলিল তৈরির আগে একজন আইনজীবী বা নোটারি পাবলিকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
হলফনামা লেখার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
- তথ্য মিলিয়ে নিন: নাম, ঠিকানা ও পরিচয়পত্র নম্বর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে।
- মিথ্যা তথ্য নয়: ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে আইনি জটিলতা হতে পারে।
- স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত ভাষা: দীর্ঘ ও অস্পষ্ট বাক্য এড়িয়ে ক্রমিক নম্বর দিয়ে লিখুন।
- সঠিক স্ট্যাম্প: প্রতিষ্ঠান কোন মূল্যের স্ট্যাম্পে হলফনামা চায়, আগে জেনে নিন।
- কপি রাখুন: নোটারি সত্যায়নের পর একটি ফটোকপি বা স্ক্যান কপি নিজের কাছে রাখুন।
- অফিসের চাহিদা যাচাই করুন: যে প্রতিষ্ঠানে জমা দেবেন, তাদের নির্দিষ্ট ফরমেট থাকলে সেটিই অনুসরণ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
হ্যাঁ, নিজে খসড়া লেখা যায়। তবে জটিল বিষয়ে আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া নিরাপদ। সত্যায়নের জন্য নোটারির সামনে যেতেই হবে।
এর নির্দিষ্ট মেয়াদ সাধারণত থাকে না, তবে অনেক প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক তারিখের হলফনামা চায়। তাই জমা দেওয়ার প্রতিষ্ঠানের নিয়ম দেখে নিন।
হ্যাঁ, “হলফনামা” হলো ইংরেজি “Affidavit”-এর বাংলা প্রতিশব্দ।
না। এটি বিবাহের নিবন্ধন বা কাবিননামার বিকল্প নয়; বিবাহ আইনানুগভাবে সম্পন্ন ও নিবন্ধিত হওয়া জরুরি।
সাধারণত প্রদানকারী লিখিতভাবে তা বাতিল করতে পারেন। বাতিলের নোটিশ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে জানানো ভালো।
উপসংহার
হলফনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল, তাই এটি তৈরির সময় সঠিক ফরমেট, সত্য তথ্য ও যথাযথ সত্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এই পোস্টে হলফনামা কি, হলফনামা ফরমেট, নোটারি পাবলিক হলফনামার নমুনা, নমুনা কপি কোর্ট ম্যারেজ হলফনামা এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নমুনা সম্পর্কে সহজ ধারণা দেওয়া হয়েছে। উপরের টেবিল থেকে আপনার প্রয়োজনীয় PDF বা Word ফাইল ডাউনলোড করে ব্যবহার করুন। কোনো প্রশ্ন থাকলে মন্তব্যে জানান, আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করব।
