অনলাইনে জিডি করার নিয়ম ও জিডির নমুনা: gd.police.gov.bd থেকে ধাপে ধাপে গাইড
লেখা: ব্লগ ডেস্ক | হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬
জিনিসপত্র হারিয়ে গেছে, অথচ থানায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর সময় নেই? এখন বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি সিস্টেমের মাধ্যমে ঘরে বসেই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা যায়। এই পোস্টে জানবেন জিডি কী, কখন করবেন, অনলাইনে কী কী লাগবে, ধাপে ধাপে কীভাবে করবেন, থানায় গিয়ে কীভাবে করবেন এবং জিডির নমুনা।
জিডি (GD) কী?
জিডি মানে জেনারেল ডায়েরি বা সাধারণ ডায়েরি। থানার রেজিস্টারে কোনো ঘটনা বা তথ্য সরকারিভাবে লিপিবদ্ধ করাকেই জিডি বলে। জিডি কোনো মামলা (এফআইআর) নয়। এটি ঘটনার একটি আনুষ্ঠানিক রেকর্ড, যা পরে নানা কাজে প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায়।

কোন কোন ক্ষেত্রে জিডি করবেন?
- মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ব্যাগ হারালে
- জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, শিক্ষাগত সনদ, ব্যাংক কার্ড বা চেক বই হারালে
- কোনো কিছু কুড়িয়ে পেলে (পাওয়া গেছে মর্মে জিডি)
- হুমকি বা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা থাকলে
- নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য জানাতে
- অন্য কোনো ঘটনা, যা আইনগতভাবে পুলিশকে অবহিত রাখা প্রয়োজন
মনে রাখবেন, ঘটনার পরপরই জিডি করা ভালো। দেরি হলে অভিযোগের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। জিডি করতে কোনো সরকারি ফি লাগে না।
অনলাইন জিডির সুবিধা
- থানায় না গিয়ে ঘরে বসে অভিযোগ জানানো যায়
- অভিযোগের সর্বশেষ অবস্থা অনলাইনে দেখা যায়
- তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থাকা যায়
- জিডির ডিজিটাল কপি ডাউনলোড করে যে কাউকে পাঠানো যায়
- অভিযোগ গ্রহণ বা অগ্রগতির খবর এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশনে জানানো হয়
অনলাইনে জিডি করতে কী কী লাগবে?
- একটি স্মার্টফোন (রেজিস্ট্রেশনের জন্য), ইন্টারনেট সংযোগ
- জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) নম্বর
- নিজের নামে নিবন্ধিত চালু মোবাইল নম্বর (ওটিপি আসবে)
- ইমেইল ঠিকানা
- বর্তমান ঠিকানা
- রেজিস্ট্রেশনের সময় নিজের লাইভ ছবি তোলার সুযোগ (ভালো আলো থাকা ভালো)
- ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান
- হারানো জিনিসের বিবরণ (যেমন মোবাইলের মডেল, IMEI নম্বর, সিম নম্বর)
- থাকলে সংশ্লিষ্ট ছবি বা কাগজপত্র আপলোডের জন্য
তথ্য যাচাইয়ের নোট: বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমবার রেজিস্ট্রেশন করতে হয় কেবল গুগল প্লে স্টোরের ‘অনলাইন জিডি’ (Online GD) অ্যাপ থেকে। রেজিস্ট্রেশনের পর অ্যাপ বা gd.police.gov.bd ওয়েবসাইট, দুটোর যেকোনোটি দিয়ে লগইন করে জিডি করা যায়। পুলিশের ওয়েবসাইটের মেনু বা বাটনের নাম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই স্ক্রিনের লেখা আপনার দেখা পেজের সঙ্গে ভিন্ন হলে নিজের পেজ অনুসরণ করুন।
ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশন (শুধু প্রথমবার)
১. অ্যাপ ডাউনলোড করুন। গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে ‘Online GD’ লিখে সার্চ করুন এবং বাংলাদেশ পুলিশের অফিসিয়াল অ্যাপটি ইনস্টল করুন। আগে পুরোনো সংস্করণ ইনস্টল করা থাকলে সেটি আনইনস্টল করে নতুনটি নিন।
📷 স্ক্রিনশট ১: প্লে স্টোরে ‘Online GD’ অ্যাপের পেজ, যেখানে Install বাটন দেখা যাচ্ছে।
২. ‘রেজিস্ট্রেশন’ বাটনে ক্লিক করুন। অ্যাপ খুলে লগইন পেজ থেকে রেজিস্ট্রেশন অপশন বেছে নিন।
📷 স্ক্রিনশট ২: অ্যাপের হোম/লগইন পেজ।
৩. NID নম্বর ও বর্তমান ঠিকানা দিন। তথ্য অবশ্যই NID-র সঙ্গে মিলিয়ে সঠিকভাবে দিন।
📷 স্ক্রিনশট ৩: NID নম্বর ও ঠিকানার ফর্ম (নম্বর ঢেকে দিন)।
৪. লাইভ ছবি তুলুন। ক্যামেরার অনুমতি দিয়ে নিজের মুখ ফ্রেমে রেখে ছবি তুলুন।
৫. মোবাইল নম্বর, ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিন। এই মোবাইল নম্বরটিই পরে আপনার ইউজারনেম হবে। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দিন এবং মনে রাখুন।
📷 স্ক্রিনশট ৪: মোবাইল, ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার পেজ।
৬. ওটিপি (OTP) দিয়ে যাচাই করুন। আপনার মোবাইলে এসএমএসে একটি কোড আসবে। কোডটি বসিয়ে সাবমিট করুন।
📷 স্ক্রিনশট ৫: ওটিপি ইনপুট পেজ (কোড ঢেকে দিন)।
৭. লগইন করুন। রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। এরপর থেকে বারবার রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না।
ধাপ ২: অনলাইনে জিডির আবেদন (তিন ধাপে)
ওয়েবসাইটে gd.police.gov.bd ঠিকানায় গিয়েও একই মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ডে লগইন করতে পারবেন। ড্যাশবোর্ডে নতুন জিডি করার বাটন থাকবে।
📷 স্ক্রিনশট ৬: gd.police.gov.bd-র হোমপেজ।
📷 স্ক্রিনশট ৭: লগইনের পর ড্যাশবোর্ড, যেখানে নতুন জিডি করার বাটন দেখা যাচ্ছে।
প্রথম ধাপ: অভিযোগের ধরন ও ঘটনার স্থান
অভিযোগের ধরন নির্বাচন করুন (যেমন হারানো বা পাওয়া গেছে)। এরপর জেলা ও থানা বেছে নিন, ঘটনার সময় ও স্থান লিখে ‘পরবর্তী’ ক্লিক করুন। থানা নির্বাচনের সময় ঘটনার স্থানের নিকটবর্তী থানা বা আপনার এলাকার থানা দিন।
📷 স্ক্রিনশট ৮: অভিযোগের ধরন, জেলা, থানা, সময় ও স্থানের ফর্ম।
দ্বিতীয় ধাপ: ঠিকানা ও বিস্তারিত বিবরণ
বর্তমান ঠিকানা ও ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা লিখুন। কী ঘটেছে, কখন, কোথায় এবং হারানো জিনিসের পরিচয়, সবই পরিষ্কারভাবে লিখুন। কোনো ছবি বা ফাইল থাকলে আপলোড করুন।
📷 স্ক্রিনশট ৯: বিবরণ লেখার বক্স ও ফাইল আপলোড অংশ।
তৃতীয় ধাপ: যাচাই ও সাবমিট
সব তথ্য আবার পড়ে দেখুন। ভুল থাকলে ‘এডিট’ করে ঠিক করুন। সব ঠিক থাকলে ‘সাবমিট’ ক্লিক করুন।
📷 স্ক্রিনশট ১০: প্রিভিউ পেজ ও সাবমিট বাটন।
📷 স্ক্রিনশট ১১: সফলভাবে জমা হওয়ার বার্তা (রেফারেন্স নম্বর ঢেকে দিন)।
জিডি জমা দেওয়ার পর কী হয়?
- সংশ্লিষ্ট থানা আপনার অভিযোগ যাচাই করে অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।
- অভিযোগ জিডিযোগ্য হলে জিডি নম্বর ও তদন্তকারী কর্মকর্তার বিবরণসহ ডিজিটাল কপি আপনাকে পাঠানো হয়।
- লগইন করে যেকোনো সময় অগ্রগতি দেখা যায়।
- অপরাধটি মামলাযোগ্য হলে থানায় উপস্থিত হতে হতে পারে। তখন প্রিন্ট কপি বা কোড নম্বর সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
📷 স্ক্রিনশট ১২: জিডির স্ট্যাটাস বা তালিকা দেখার পেজ এবং ডাউনলোড করা জিডি কপি (ব্যক্তিগত তথ্য ঢেকে)।
অফলাইনে (থানায় গিয়ে) জিডি করার নিয়ম
১. ঘটনার স্থানের নিকটবর্তী থানায় যান। কোন থানা তা নিশ্চিত না হলে যেকোনো নিকটস্থ থানায় গেলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা পথ দেখাবেন।
২. সঙ্গে নিন: NID বা পরিচয়পত্রের ফটোকপি, হারানো জিনিসের তথ্য (যেমন মোবাইলের IMEI, ক্রয়ের রসিদ বা বক্সের ছবি), এবং হাতে লেখা বা টাইপ করা আবেদন।
৩. থানার ডিউটি অফিসার বা অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) আবেদনটি দিন। তিনি বিষয়টি থানার জিডি বইয়ে লিপিবদ্ধ করবেন।
৪. আবেদনের একটি কপিতে থানার সিল, জিডি নম্বর ও তারিখসহ স্বাক্ষর নিয়ে নিন। এটিই আপনার জিডির কপি।
৫. জিডির কপি সংরক্ষণ করুন এবং স্ক্যান বা ছবি তুলে রাখুন। পরে সিম উত্তোলন, নতুন সনদ বা কার্ডের আবেদনে লাগবে।
থানায় জিডি লেখাতে কোনো টাকা দিতে হয় না। কেউ টাকা চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।
জিডির নমুনা
নিচের নমুনা দেখে নিজের ঘটনা অনুযায়ী বদলে নিন।
নমুনা ১: মোবাইল ফোন হারানোর জিডি
তারিখ: ২৭/১০/২০২৬
বরাবর, অফিসার ইনচার্জ [আপনার থানার নাম] থানা, [জেলা]।
বিষয়: মোবাইল ফোন হারানো প্রসঙ্গে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার আবেদন।
জনাব, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি [আপনার নাম], পিতা: [পিতার নাম], মাতা: [মাতার নাম], গ্রাম/মহল্লা: [ঠিকানা], ডাকঘর: [ডাকঘর], থানা: [থানা], জেলা: [জেলা]। আমার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর [NID নম্বর] এবং মোবাইল নম্বর [যোগাযোগের নম্বর]।
গত ২৬/১০/২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার সময় [স্থানের নাম] এলাকায় যাতায়াতের সময় আমার একটি মোবাইল ফোন কোথাও পড়ে যায় বা হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ফোনটি পাওয়া যায়নি। ফোনটির বিবরণ নিম্নরূপ:
- মোবাইলের ব্র্যান্ড ও মডেল: [যেমন: … ]
- IMEI-১: [১৫ ডিজিটের নম্বর]
- IMEI-২: [১৫ ডিজিটের নম্বর]
- সিম নম্বর: [হারানো সিমের নম্বর ও অপারেটর]
ফোনটি অন্য কেউ অপব্যবহার করলে তার দায়ভার আমার থাকবে না। তাই বিষয়টি থানার সাধারণ ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
নিবেদক [আপনার নাম ও স্বাক্ষর] মোবাইল: [নম্বর]
সংযুক্তি: NID-র ফটোকপি; মোবাইলের বক্সের/রসিদের কপি (থাকলে)।
নমুনা ২: জাতীয় পরিচয়পত্র বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হারানোর জিডি (সংক্ষিপ্ত)
বিষয়: জাতীয় পরিচয়পত্র/[কাগজের নাম] হারানো প্রসঙ্গে জিডি।
জনাব, আমি [নাম], পিতা [পিতার নাম], ঠিকানা [ঠিকানা]। গত [তারিখ] আনুমানিক [সময়] ঘটিকায় [স্থান] থেকে আমার জাতীয় পরিচয়পত্র (নম্বর: [নম্বর]) হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজ করেও পাইনি। কেউ এটি অপব্যবহার করলে আমি দায়ী থাকব না। অতএব বিষয়টি জিডিভুক্ত করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
নিবেদক [নাম, স্বাক্ষর, মোবাইল নম্বর]
অনলাইনে জিডি করলে এই বিবরণটিই দ্বিতীয় ধাপের ‘ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ’ ঘরে লিখে দিতে পারেন।
জিডি করার সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- সঠিক তথ্য দিন। মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া আইনত অপরাধ হতে পারে।
- বিবরণ হোক স্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক। কী, কখন, কোথায়, কীভাবে, এই চারটি প্রশ্নের উত্তর রাখুন।
- রেফারেন্স নম্বর ও জিডি কপি সংরক্ষণ করুন। পরে অবস্থা জানতে বা অন্য কাজে লাগবে।
- দেরি করবেন না। ঘটনার পর যত দ্রুত সম্ভব জিডি করুন।
- জরুরি বিপদে জিডি নয়, ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন। জিডি জরুরি সহায়তার বিকল্প নয়।
- ভুয়া ওয়েবসাইট থেকে সাবধান। পুলিশের অফিসিয়াল ঠিকানা gd.police.gov.bd। অনলাইন জিডির জন্য কেউ টাকা চাইলে বা তৃতীয় পক্ষের সাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বললে সতর্ক হোন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অনলাইন জিডি কি আইনিভাবে বৈধ? এটি বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি উদ্যোগ এবং প্রাথমিক তথ্য হিসেবে কার্যকর। তবে কোন ক্ষেত্রে কী কাগজ গ্রহণযোগ্য, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (যেমন মোবাইল অপারেটর, পাসপোর্ট অফিস, ব্যাংক) থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
জিডি করতে কি টাকা লাগে? না, জিডি করতে সরকারি কোনো ফি নেই।
ওয়েবসাইট থেকেই কি রেজিস্ট্রেশন করা যায়? সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন অ্যাপ থেকে করতে হয়, এরপর ওয়েবসাইট ও অ্যাপ দুটোতেই লগইন করা যায়।
সব ধরনের ঘটনায় কি অনলাইন জিডি হয়? হারানো-পাওয়ার মতো বিষয়ে সহজে হয়। অপরাধ মামলাযোগ্য হলে থানায় যেতে বা মামলা করতে হতে পারে।
সমস্যায় পড়লে যোগাযোগ
- হটলাইন ও হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৩২০০০১৪২৮ (২৪ ঘণ্টা)
- ইমেইল: gd@police.gov.bd
- ঠিকানা: ৬ ফিনিক্স রোড, ফুলবাড়িয়া, ঢাকা
শেষ কথা
অনলাইন জিডি সিস্টেম সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমিয়েছে। একবার রেজিস্ট্রেশন করে রাখলে প্রয়োজনের সময় কয়েক মিনিটেই জিডি করা যায়। তবু যেকোনো ক্ষেত্রে থানায় গিয়ে সরাসরি জিডি করার সুযোগ সবসময় খোলা আছে। আপনার কাছে কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানান।
