বেগম খালেদা জিয়ার মা তৈয়বা মজুমদারের দিকে তাকিয়ে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান একদিন অকপটে বলেছিলেন,
“খালাম্মা! আমি আপনার জামাই হতে চাই।”
হঠাৎ এমন প্রস্তাবে মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলেন তৈয়বা মজুমদার। তারপর মুখ টিপে এক চিলতে হাসি। মেয়ের ভবিষ্যৎ কি তবে এমনই কোনো বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে—সে ভাবনা হয়তো তখনই উঁকি দিয়েছিল তাঁর মনে। ইস্কান্দার মজুমদার বাড়ি ফিরলে স্ত্রীর কাছে শোনা কথাটা তাঁকে জানালেন। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেছিলেন,
“মন্দ কী? ছেলে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন, দেখতে-শুনতে স্মার্ট, তার ওপর আমাদের চেনা-জানা। পুতুলের সঙ্গে ওকে ভালোই মানাবে।”
আসলে তরুণ জিয়ার হৃদয়ে প্রেমের বীজটি অঙ্কুরিত হয়েছিল অনেক আগেই। নিজের চোখে দেখার আগেই তিনি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন খালাতো বোন পুতুলের রূপকথার মতো সৌন্দর্যে। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা তিনি শুনেছিলেন নানার মুখে। মকবুল সাহেব বলেছিলেন,
“ওকে অন্ধকার রাতে দেখলে মনে হবে—আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।”

নানার সেই কথাকে হয়তো অতিশয়োক্তি ভেবেছিলেন জিয়া। কিন্তু যখন প্রথমবার খালেদা জিয়াকে সরাসরি দেখলেন, তখন বুঝলেন—এটি নিছক প্রশংসা নয়, একেবারে নির্মোহ সত্য।
২.
১৯৬০ সালের আগস্ট মাস। সময়ের পাতায় এক নিঃশব্দ কিন্তু ঐতিহাসিক বাঁক। আকদ সম্পন্ন হলো। ক্যাপ্টেন জিয়ার বয়স তখন ২৪, আর খালেদা জিয়ার মাত্র ১৫। বয়সের ব্যবধান ৯ বছর—কিন্তু ভবিষ্যতের দূরত্ব ছিল তার চেয়েও বিস্ময়কর।
দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ার বাসায় কনে সেজে বসে থাকা খালেদা জিয়া তখনও জানতেন না, যে তরুণ সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি জীবনের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন, তিনি একদিন হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আর তিনি নিজে—হয়ে উঠবেন এই দেশের প্রধানমন্ত্রী, একাধিকবার।
এক বছর পর ঢাকার শাহবাগ হোটেলে অনুষ্ঠিত হলো তাঁদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। আজ যে জায়গাটি পিজি হাসপাতাল নামে পরিচিত, সেখানেই আয়োজন করা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান। বিস্ময়কর কাকতালীয়তায়, সেই সংবর্ধনার বছর থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ২০ বছর। আবার জিয়ার শাহাদাত থেকে বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতারোহণ—আরও ১০ বছর।
সময় যেন এই দম্পতির জীবনে অদ্ভুত এক ছন্দে এগিয়ে চলেছিল। ব্যক্তিগত জীবন, রাষ্ট্রক্ষমতা, ত্যাগ ও ট্র্যাজেডি—সব মিলিয়ে তাঁদের গল্প হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
৩.
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ে এখন পর্যন্ত ১৬ জন রাষ্ট্রপতি ও ১০ জন প্রধানমন্ত্রী এই দেশের শাসনভার সামলেছেন। কিন্তু সব নামের ভিড় ছাপিয়ে দু’টি নাম আজও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে গেঁথে আছে—
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা—এই দুই মানদণ্ডে এখনো কেউ তাঁদের ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তাঁরা কেবল ক্ষমতাসীন ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক।
আজ শহীদ জিয়ার পথ ধরেই বেগম খালেদা জিয়াও ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে গেলেন। তাঁদের দুজনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজ এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া—দুজনই এখন গৌরবোজ্জ্বল অতীত, অনুপ্রেরণার উৎস।
ঠিক কোন গুণে, কোন নীতিতে, কোন সাহসে তাঁরা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়াই আজ বিএনপির জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ। নিছক ক্ষমতার মোহে পড়ে যেন নিজেদের আদর্শ বিসর্জন না দেয় দলটি। ইতিহাস বড় নির্মম; সে কখনোই আদর্শহীন আপসকে ক্ষমা করে না।
৪.
শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁদের চরিত্রের দৃঢ়তা। তাঁরা রাজনীতিকে কখনোই কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন দায়িত্ব, আত্মত্যাগ ও জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা হিসেবে। জিয়া ছিলেন একজন সোজাসাপটা সৈনিক—যিনি জানতেন কীভাবে শৃঙ্খলা দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে হয়, আবার কীভাবে সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে হয়। আর খালেদা জিয়া ছিলেন এক নীরব সহিষ্ণু সংগ্রামী নারী—যিনি স্বামীর শাহাদাতের পরও ভেঙে পড়েননি, বরং ভাঙা বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন জাতির সামনে।
একজন যুদ্ধক্ষেত্রের মানুষ, অন্যজন ঘর থেকে উঠে আসা রাজনীতির কঠিন পথে পা রাখা নারী—এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতা এক হয়ে যে নেতৃত্ব তৈরি করেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। জিয়া দেশকে দিয়েছিলেন আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবাদের ভাষা, আর খালেদা জিয়া সেই ভাষাকে রক্ষা করেছিলেন আপসহীন অবস্থান দিয়ে।
৫.
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এই—তিনি সহজে নতিস্বীকার করেননি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কারাবরণ, অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা—সবকিছুর মাঝেও তিনি মাথা উঁচু করে ছিলেন। ক্ষমতায় থেকেছেন, ক্ষমতার বাইরে থেকেছেন—দুই অবস্থাতেই তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের ফল নয়; এটি ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সংযোগের প্রতিফলন।
গ্রামবাংলার সাধারণ নারী, শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার, প্রবীণরা—অনেকেই তাঁর মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছেন। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ হয়েও ছিলেন ঘরের মেয়ের মতো দৃঢ় ও সংযত। এই মানবিক জায়গাটিই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
৬.
আজ যখন শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া—দুজনই অতীতের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, তখন ইতিহাস আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়:
তাঁদের উত্তরাধিকার কে বহন করবে, আর কীভাবে করবে?
উত্তরাধিকার মানে শুধু নাম ব্যবহার নয়, ছবি টাঙানো নয়, কিংবা আবেগী স্লোগানও নয়। উত্তরাধিকার মানে হলো—
- আত্মমর্যাদার রাজনীতি
- আপসহীন নৈতিক অবস্থান
- জনগণের সঙ্গে সৎ সম্পর্ক
- এবং ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখা
এই চারটি জায়গায় যদি বিএনপি আত্মসমালোচনার সাহস দেখাতে না পারে, তবে শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া কেবল স্মৃতির ফ্রেমেই বন্দী হয়ে থাকবেন।
৭.
বাংলাদেশের রাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই আসল জয়। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া সেই জয় অর্জন করেছিলেন বলেই আজও তাঁদের নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে।
সময় একদিন সব হিসাব নেয়। কে কত বছর ক্ষমতায় ছিল, তা নয়—বরং কে কতটা সাহস নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পেরেছিল, সেটাই ইতিহাস মনে রাখে। সেই বিচারে শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র।
আজ তাঁদের দুজনের জীবনগাথা আমাদের শুধু অতীতের গল্প শোনায় না; ভবিষ্যতের পথও দেখায়। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পথ চিনে নিতে পারব?