ইসলাম ধর্মে কোরবানি ও কোরবানি সম্পর্কে নবীজির ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

আসসালামু আলাইকুম, আপনারা সবাই কেমন আছেন আশা করি ভাল আছেন। আল্লাহর রহমতে আমি ভাল আছি। আসুন আর সময় নষ্ট না মুল আলোচনায় যাই। আজকে আমাদের আলচ্য বিষয় হলো কুরবানী অসুন জেনে নেই কুরবানী কি এবং কুরবানী সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস।

 

 কোরবানী কি ? বা কোরবানি অর্থ কি ?

কোরবানি শব্দের অর্থ হলো নৈকট্য লাভ, সান্নিধ্য, উৎসর্গ, ত্যাগ করা বা সন্তুষ্টি লাভ করা। ঈদুল আজহার দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্বাচনকৃত পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। (মাজমাউল আনহুর : ২/৫১৬) অন্য সব ইবাদতের মতই আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় পবিত্র কোরবানি করার বিষয়ে নির্দেশ করা হয়েছে। নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এ সম্পর্কে  দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

কোরবানির নিয়ম ?

‘কোরবানীর জন্য পশু’ আগের থেকেই নির্বাচন করা হক অথবা ঈদুল আজহার দিনগুলোতেই ক্রয় কার হোক উভয় পদ্ধিতে কোরবানী করার কোন বাধা নেই তা বৈধ।  যদি কেউ বলে এই পশু কোরবানির জন্য রেখে দিব অথবা নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয় তাহলে তার জন্য তাহলে তার জন্য কোরবানী করা ওয়াজিব। আর যদি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক না হন তাহলে তার জন্য ‘কোরবানী মোস্তাহাব’ তবে যদি ‘কোরবানীর উদেশ্যে পশু’ কিনেন তাহলে ওয়াজিব।’

আরও পড়ুনঃ

কোরবানির ইতিহাস

‘হজরত  ইবরাহিম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আঃ)  কে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন’। তখন থেকেই ‘ইসলাম ধর্মে কোরবানি  করার রীতি’ চালু রয়েছে। তবে সেই ঘটনা ইসলামে কোরবানি দেওয়ার প্রথম ঘটনা নয়। কারণ ইসলামের প্রথম নবী ও প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) – এর সময়েও কোরবানি চর্চা প্রচলিত ছিল। যা আমরা বিস্তারিত জানতে পারব নিচে হাবিল কাবিলের কোরবানি অনুচ্ছেদে।

 ‘হাবিল কাবিলের কোরবানি’

ইসলাম ধর্মের প্রথম নবী ও প্রথম মানব হজরত আদম (আঃ)-এর দুই পুত্র ‘হাবিল ও কাবিল।’ (সে সময় মা হাওয়ার গর্ভ থেকে দুটি করে সন্তান জন্ম হতো। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে)। শরিয়ত মতাবেক, কাবিলের সঙ্গে জন্ম নেওয়া  বোন আকলিমাকে বিয়ে করবেন হাবিল আর হাবিলের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেওয়া  বোনকে বিয়ে করবেন কাবিল। আকলিমা ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী তাই কাবিল জীবনসঙ্গী হিসাবে আকলিমাকেই চাইতেন।

একটা পর্যায়ে কাবিল বাবার কাছে গিয়ে কাবিল বললেন, আব্বাজান! আমি আকলিমাকেই বিয়ে করতে চাই। উত্তরে প্রথম মানব হজরত আদম (আঃ) বিষণ্ন মনে বললেন, সে তো তোমার ভাই হাবিলের জন্য নির্ধারিত। সে সময় হাবিল পাশেই ছিলেন । এবার হজরত আদম (আঃ) দুই পুত্রকে উদ্দেশ করে দরদি কন্ঠে বললেন, তোমরা  আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি কর। যার কোরবানি কবুল হবে সেই আকলিমাকে বিয়ে করবে।

সে সময় নিয়ম ছিল, কোরবানির পশু বা বস্তু একটি খোলা যায়গায় রেখতে হবে যদি আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কোরবানি কবুল হবে। আর যদি কোরবানির জিনিষ সমুহ অক্ষত আবস্থায় থাকে তাহলে সেই কোরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি।

হাবিল পেশায় রাখাল হওয়ায় তার দুম্বার পাল থেকে সবচেয়ে সুন্দর ও মোটা দুম্বাটি রেখে এলেন কোরবানির জন্য । আর কাবিল পেশায় কৃষক হওয়ায় পাশেই তার শস্যদানা কোরবানির উদ্দেশ্যে রেখে আসলেন। পরের দিন সকাল বেলা দেখা গেলো হাবিলে কোরবানি কবুল অর্থাৎ দুম্বাটি জ্বলে গিয়েছে অন্যদিকে কাবিলে শস্যদানা যেমন ছিল তেমনি পরে রয়েছে অর্থাৎ  কোরবানী কবুল হয় নি। এ দেখে কাবিল রেগে যান।

তুমি কেন শুধু শুধু আমার ওপর রাগ করছ ভাই কাবিল। আমরা দুজনই তো কোরবানি  করেছি। আল্লাহ আমারটা কবুল করেছেন। আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন। তুমিও আল্লাহ নির্দেশ মাফিক জীবন গঠন কর। দয়াময় আল্লাহ  তোমার কোরবানিও কবুল করবেন।

কোরবানি সম্পর্কে নবীজির ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস।

 কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং – ১

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (একটি) গরু সাত জনের পক্ষ হতে এবং (একটি) উট সাত জনের পক্ষ হতে (কোরবানি করা যায়)

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস  নং- ২

আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কালো ও সাদা পুরুষ (বড় শিংযুক্ত) দুম্বা কোরবানি করেছেন। আমি দেখেছিলাম যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুম্বার গলায় পা রেখে বলে নিজ হাতে জবেহ করলেন।

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৩

আবদুল্লাহ ইবনে আমর [রা.] থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমাকে কোরবানির দিবসে ঈদ (উদযাপনের) আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তা এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন।’

 

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৪

এক ব্যক্তি আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যদি কেবল একটি মাণিহা (উটনী) থাকে (যা আমাকে কেবল দুধ পান করতে দেওয়া হয়েছে) আমি কি মাণিহা (উটনী) টিকে কোরবানি দিতে পারি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন না। তবে আপনি চুল, নখ এবং গোঁফ কেটে নাভির নীচে চুল পরিষ্কার করবেন। এটি আল্লাহর দরবারে আপনার পূর্ণ ত্যাগ হিসাবে বিবেচিত হবে অর্থাৎ পূর্ণ কোরবানি বলে বিবেচিত হবে।।  নোট: ‘মানীহা’ হচ্ছে, যে পশু কাউকে দুধ পান করার জন্য বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়।

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং-৫

হযরত জাবির [রা.] থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে, ‘অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি উট নাহর করলেন।

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৬

 গরু ও উটে সাত শরীক হতে পারে জাবির [রা.] বলেন, আমরা হজের ইহরাম বেঁধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম। তিনি আমাদেরকে আদেশ করলেন যেন আমরা প্রতিটি উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হয়ে কোরবানি করি।

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৭

জাবির [রা.] থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা (কোরবানিতে) ‘মুছিন্না’ ছাড়া জবেহ করবে না। তবে সংকটের অবস্থায় ছ’মাস বয়সী ভেড়া-দুম্বা জবেহ করতে পারবে।’

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৮

‘কোরবান করার জন্য গরু বা মহিষ‘ দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এক বছর, আর উট অন্তত পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। উপরোক্ত হাদিস থেকে জানা গেল ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে ছয় মাসের হলেও চলবে।

 যে ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি হয় না ?

বারা ইবনে আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু কোরবানির পশু নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাত দিয়ে ইশারা  বলেছেন, চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না। যে পশুর এক চোখের দৃষ্টিহীনতা স্পষ্ট, যে পশু অতি রুগ্ন, যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং যে পশু এত শীর্ণ যে, তার হাড়ে মগজ নেই।’ লোকেরা বলল, আমরা তো দাঁত, কান ও লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী (দ্বারা কোরবানি করা) ও অপছন্দ করি? তিনি বলেছিলেন যার যা খুশি অপছন্দ করতে পার কিন্ত অন্যের জন্য তা হারাম করা  যাবে  না। ‘

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ৯

আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কান-কাটা পশু ও শিং-ভাঙ্গা পশু দ্বারা কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন।

কোরবানি সম্পর্কে হাদিস নং- ১০

বারা ইবনে আযীব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে একটি খুতবা প্রদান করলেন।” তিনি বললেন, “এ দিন আমাদের প্রথম কাজ হল নামাজ পড়া এরপর কোরবানি করা। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাজ অদায় করার পরে কোরবানি করবে তার তা ইসলামের তরিকা মত হবে। আর যে ব্যক্তি আগেই জবাই করবে ( ইসলামের তরিকা মত হবে না)। তবে ধরে নিতে হবে এটি পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত মাংস মাত্র, কোরবানি নয় (আল্লাহর উদ্দেশ্যে উত্সর্গীকৃত)।

কোরবানি সম্পর্কে কোরআনের আয়াত

সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৭-১০৮
আল মুহিতুল বুরহানি : ৬/৮৫
বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯২
সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০২-১০৯
সূরা : হজ, আয়াত : ৩৪
সূরা : কাউসার, আয়াত : ১-৩
সূরা : আনআম, আয়াত : ১৬২-১৬৩
সূরা : হজ, আয়াত : ২৮ 

কোরবানির গরু জবাই এর নিয়ম

‘নিজের কোরবানির গরু বা পশু নিজে জবাই করা মুস্তাহাব’। যদি নিজের পক্ষে সম্ভব না তা হলে অন্য কোন ব্যক্তিকে দিয়ে করাতে হবে সে ক্ষেত্রে পশুর মালিক বা ‘কোরবানি দাতা জবাই এর সময় সামনে থাকা উত্তম।’

‘পশু জবাই এর সময় পশুকে ক্বিবলামুখী করে শোয়াতে’ হবে এবং ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবাই করতে হবে’। যদি কেই ইচ্ছা  ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে পশু জবাই করে তাহলে সেই পশু ‘মাংস খাওয়া হারাম হয়ে যাবে’। আর যদি ভুলবশত ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ না বলে তবে তা খাওয়া বৈধ।

কোরবানির গরু বা পশুর বয়স

‘কোরবান করার জন্য গরু বা মহিষ‘ দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এক বছর, আর উট অন্তত পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। তবে সংকটের অবস্থায় ছ’মাস বয়সী ভেড়া-দুম্বা জবেহ করতে পারবে।

কোরবানি কোন ভাষার শব্দ ?

কোরবানি আরবি শব্দ‘ যার বাংলা অর্থ  নৈকট্য লাভ, সান্নিধ্য, উৎসর্গ, ত্যাগ করা বা সন্তুষ্টি লাভ করা ।

কোরবানি ঈদ ২০২১

 

Leave a Comment